
সাহাদাৎ হোসেন চৌধুরী : সোনারগাঁও সংবাদদাতা:
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে তীব্র গ্যাস সংকটে জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই ভয়াবহ সংকটের কারণে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের রান্নাবান্না প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। গ্যাসের সামাণ্যতম চাপ না থাকায় আধুনিক রান্নাঘর ছেড়ে বাধ্য হয়ে হাজার হাজার পরিবারকে ঝুঁকতে হচ্ছে আদিম পদ্ধতির জ্বালানি মাটির চুলা ও কেরোসিনের স্টোপ চুলায় ।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সোনারগাঁওয়ের বিভিন্ন গ্রুপ পেজ সহ ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে।
এই চরম দুর্ভোগ আর কর্তৃপক্ষের নির্বিকার ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভের আগুনে ফুঁসছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ।
বৃহস্পতিবার দিনভর গ্যাস না থাকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে নেটিজেনরা বিভিন্ন নেতিবাচক মন্তব্য ও পোস্ট করছেন।
একজন ক্ষুব্ধ নাগরিক লিখেছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশের যুগে এসেও পেটের দায়ে ফের মাটির চুলার ধোঁয়া টানতে হচ্ছে, এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কী হতে পারে!
আরেকজন লিখেছেন, গ্যাস পাই না, অথচ ঠিক সময়ে ঠিকই বিল দিতে হয় এটা জনগণের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা। অনেকেই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে কঠোর আন্দোলনের হুশিয়ারিও দিয়েছেন সামাজিক মাধ্যমে।
সাধারণ মানুষের রান্নার চুলার এই হাহাকারের পেছনে স্থানীয়দের একটি বড় ক্ষোভ লুকিয়ে আছে অবৈধ চুন কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সোনারগাঁও এলাকায় গড়ে ওঠা অসংখ্য অবৈধ চুনা কারখানা দেদারসে গ্যাস চুরি করে দিনে-রাতে চুনা পোড়াচ্ছে। যার ফলে সাধারণ গ্রাহকরা গ্যাসের সামান্য চাপ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন এবং এলাকায় কৃত্রিম ও স্থায়ী গ্যাস সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি অবৈধ ভাবে গ্যাস ব্যবহার করে আসছে তন্মধ্যে বেশ কয়েকটি চুনা কারখানা গুড়িয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ কিন্তু তাতেও বিভিন্নভাবে গ্যাসের অবৈধ সংযোগের দ্বারা অনেক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর দাবি, অবিলম্বে এসব অবৈধ চুনা কারখানার বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালিয়ে গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে এবং গ্যাস চুরি রোধে প্রশাসনের দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভুক্তভোগী গৃহিণী শাহনাজ বেগম জানান, দিনের বেলা তো দূরের কথা, রাতের গভীর কিংবা ভোরের দিকেও গ্যাসের দেখা মেলে না।
এছাড়া শতশত আবাসিক মাদ্রাসা গুলোতেও বাধ্য হয়ে ছাত্রদেরকে ছুটি দিতে দেখা গেছে।ছুটিতে যাওয়া ছাত্ররা জানায় আমাদের দুপুরের খাবার বিকেল ৪টায় পরিবেশনের পর ছুটি দিয়ে দেয়।
সোনারগাঁও পৌরসভা এলাকার রহিমা আক্তার হতাশা প্রকাশ করে বলেন, গ্যাসের অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে রান্নার সময় পার হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে মাটির চুলায় কাঠ পুড়িয়ে রান্না করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি খরচ ও সময়ের অপচয়ের পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর ধোঁয়ায় পরিবারের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।
এই প্রতিবেদক তার নিজ গৃহে স্টোপের জন্য কেরোসিন কিনতে গিয়ে জানতে পারে কেরোসিনের দাম ১২০ থেকে ১৪০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ করে ভাড়ায় থাকা ছোট পরিবারের সদস্যরা হোটেল রেস্তোয়ায় গিয়ে ফেরত আসছে , সকাল থেকে বেশ কয়েকটি হোটেলের সামনের চিত্রে দেখা যায় লম্বা লাইনে সিরিয়াল দেখে খাবার না মিলার আশঙ্খায় ফিরে আসছে। চায়ের দোকান গুলোতে রুটি,কেক,বিস্কুট,কলাসহ নাস্তা জাতিয় খাদ্য কিনে খেতে দেখা গেছে ।
সোনারগাঁও সর্বত্র এলাকায় লাইনের গ্যাস থাকার কারণে এলপি গ্যাসের ব্যবহার অনেকাংশ কমই বলা চলে ,যার কারণে হঠাৎ দীর্ঘ সময় গ্যাস না থাকার ফলে ইলেক্ট্রিক হিটার কিনতে দেখা গেছে। তবে অধিকাংশ এলাকায় মাটির চুলায় রান্না করার দৃশ্য চোখে পড়ে।
মেঘনা শিল্পাঞ্চল প্রতাপের চর এলাকার সুরভী আকতার বলেন, চুলায় সামান্য আঁচও থাকে না। মাসের নির্ধারিত গ্যাস বিল ঠিকই দিতে হয়, অথচ রান্নার জন্য বিকল্প হিসেবে কাঠ বা অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এই গ্যাস সংকটের যন্ত্রণায় আমাদের জীবন অতিষ্ঠ।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের মেঘনা শাখার ম্যানেজার সুরজিত সাহা জানান, গ্যাস সংকট শুধু সোনারগাঁওয়ের স্থানীয় কোনো সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় সমস্যা। বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজ থেকে গ্যাস খালাসে বিঘ্ন ঘটায় সরবরাহ কমেছে। জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস বরাদ্দ না পাওয়ায় গ্রাহকদের চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে অবৈধ সংযোগ ও গ্যাস চুরির বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি।